Uncategorized

সেই নূপুর শর্মা কেলেংকারি-পুলিশের সামনে অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা

নড়াইল প্রতিনিধি : সেই নূপুর শর্মা কেলেংকারি-পুলিশের সামনে অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা দিয়েছে বিক্ষুদ্ধ জনতা।
নড়াইল সদরের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজে এ ঘটনা ঘটেছে। অধ্যক্ষ ও ওই কলেজের এক ছাত্রের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির আহবায়ক করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জুবায়ের চৌধুরীকে।
এ কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন-জেলা শিক্ষা অফিসার মো. ছায়েদুর রহমান ও সদর থানার ওসি শেখ শওকত কবীর। অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার রিয়াজুল ইসলামকে আহবায়ক করে পুলিশ প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ডিআই ওয়ান মীর শরীফুল হক ও পুলিশ পরিদর্শক (অপরাধ) রফিকুল ইসলাম। তাদের ৩০ জুনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।

সোমবার (২৭ জুন) সরেজমিনে সদর উপজেলার বড়কুলা গ্রামে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ওই পরিবারের নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ সময় পরিচয় দিয়ে পুলিশের অনুমতি নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করতে হয়। তাদের পরিবারের সদস্যরা বাড়ির বাইরে যেতে চাইলে পুলিশের অনুমতি নিয়ে যেতে হয়।
এ ব্যাপারে অধ্যক্ষের মা বনলতা বিশ্বাস বলেন, কলেজের ঘটনায় পুলিশ আমার ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার পর আর বাড়ি আসেনি। আমার সঙ্গে ফোনেও যোগাযোগ করেনি।

মহানবী (সা.)-কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যকারী ভারতের বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে ফেসবুকে ওই কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলেন ওই কলেজের ছাত্র ও স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা। একই ধর্মের হওয়ায় তাকে সাপোর্ট দিচ্ছে- এমন অভিযোগ তুলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেন। এ সময় তাদের পাশে পুলিশের অবস্থান দেখা গেছে।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত কলেজছাত্রের সঙ্গে আটক করা হয় অধ্যক্ষকে। তবে এ ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় ওই দিনই থানা হাজত থেকে অধ্যক্ষকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
কিন্তু ভয়ে ও আতঙ্কে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ওই শিক্ষক পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবার। শুধু তাই নয়, ঘটনার পর থেকেই পরিবারের প্রধান আত্মগোপনে থাকায় ওই অধ্যক্ষের পরিবার গত ৯ দিন যাবত পুলিশ প্রহরায় অনেকটা গৃহবন্দি হয়ে আছেন।

এছাড়া ঘটনার পর থেকে যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কলেজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি ওই এলাকায় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সেখানে একদিকে যেমন উত্তেজনা বিরাজ করছে, অন্যদিকে স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যে রয়েছে আতঙ্ক। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই ঘটনাটি ঘটলেও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সেদিনকার উপস্থিত জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নড়াইলে এ ঘটনার সূত্রপাত ১৭ জুন। ওই দিন মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির এক ছাত্র নিজের ফেসবুক আইডিতে বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার ছবি দিয়ে পোস্ট করেন- ‘প্রণাম নিও বস ‘নূপুর শর্মা’ জয় শ্রীরাম’। বিষয়টি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে কলেজের কিছু ছাত্র তাকে সেটি মুছে (ডিলিট) ফেলতে বলেন। এরপর ১৮ জুন সকালে অভিযুক্ত ছাত্র কলেজে আসলে তার সহপাঠীসহ সব মুসলিম ছাত্র তার গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও তাৎক্ষণিক বহিষ্কারের দাবি তুলে অধ্যক্ষের কাছে বিচার দেয়। কিন্তু ওই সময় ‘অধ্যক্ষ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক হওয়ায় তাকে রক্ষা করার চেষ্টায় ওই ছাত্রের পক্ষ নিয়েছেন’ এমন কথা রটানো হলে উত্তেজনা তৈরি হয়।

এ সময় বিষয়টি কলেজের গণ্ডি ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অভিযুক্ত ছাত্র ও অধ্যক্ষের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে কলেজ ক্যাম্পাস। খবর পেয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি দল ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষুব্ধ জনতাকে লাঠিচার্জ করলে পরিস্থিতি আরও অশান্ত হয়ে ওঠে। এরপর পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত জনতার মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাধে। দিনভর পুলিশ ও ছাত্র-জনতা দফায় দফায় সংঘর্ষে দুই পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। এ সময় মারাত্মক আহত হন কলেজের বাংলা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক শ্যামল কুমার ঘোষ। ওই সময় বিক্ষুব্ধ জনতা কলেজের শিক্ষকদের ৩টি মোটরসাইকেল আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এরপর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তাদের উপস্থিতিতে উত্তেজিত জনতা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্রের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরিয়ে দিয়েছিল। এ সময় গ্রেফতারের দাবি জানালে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস, অভিযুক্ত রাহুল দেব রায় ও তার বাবা বাবুল রায়কে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এসব ঘটনার কিছু ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে আসে। এরপর থেকে পুলিশের উপস্থিতিতে অধ্যক্ষের গলায় জুতার মালা পরানোর ঘটনায় ক্ষোভ চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এ ধরনের পাশবিক উপায়ে সম্মানিত অধ্যক্ষকে অপমানিত করা হয়েছে, তাতে সারা দেশের শিক্ষক সমাজের সঙ্গে শান্তিপ্রিয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। ভার্চুয়াল জগত ছেড়ে সেই প্রতিবাদ এবার মাঠেও নামছে। পুলিশের সামনে কী করে একজন শিক্ষককে এভাবে অসম্মান করা গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজধানীর শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

একই বিষয়ে অধ্যক্ষের চাচাতো ভাই সুমিত্র কুমার বিশ্বাস বলেন, আমরা যতটুকু জেনেছি কলেজের ঘটনায় তাকে নিরাপত্তা দিয়ে থানা হেফাজতে রাখার পর ওই দিনই রিলিজ দেওয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তার অভাবে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। এরপর থেকে আমাদের বাড়িটিতে সবসময় পুলিশ পাহারায় রয়েছে। প্রথমদিকে বাড়ির ওঠানেই অবস্থান করলেও থাকার সমস্যার কারণে বাড়ির প্রবেশ মুখেই একটি সর্বজনীন মন্দিরে রাতদিন ২৪ ঘণ্টায় পুলিশ প্রহরায় রয়েছে বলে তিনি জানান। এর আগে অভিযুক্ত ছাত্র রাহুল দেব রায়ের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করার পর সে কারাগারে আছেন। অন্যদিকে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে অব্যাহতি দিয়ে ওই কলেজের শিক্ষক আকতার হোসেন টিংকুকে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার প্রবীর কুমার রায় বলেন, তখন জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলার কাজে ব্যস্ত থাকায় অধ্যক্ষের গলায় কে-বা কারা কখন মালা পরিয়েছে তা লক্ষ্য করিনি। তবে এ বিষয়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দোষী যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তদন্ত কমিটিকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে রিপোর্ট দাখিল করতে বলা হয়েছে। একই প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, কলেজ ভবন থেকে বের করে আনার সময় উত্তেজিত জনতার হাত থেকে অধ্যক্ষ ও শিক্ষার্থীকে বাঁচানোর জন্য পুলিশ হয়তো জুতার মালা পরানোর বিষয়টি লক্ষ্য করেনি। এসব ঘটনা তদন্তের জন্য ৩ সদস্যবিশিষ্ট পৃথক দুটি তদন্ত কমিটির গঠন করা হয়েছে।

 

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button