বিশেষ প্রতিবেদন

ধরাসায়ীর ভয়ে আতংক!হেভিওয়েটে মন্ত্রী নেতাদের ডেরায় স্বতন্ত্ররা

 

আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই।আর নিজ দলের এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে হেভিওয়েট প্রার্থীরাও। 

 

বিশেষ প্রতিনিধি : ধরাসায়ীর ভয়ে আতংকিত আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট মন্ত্রী ও নেতারা। অনেকেই ধরাসায়ীর ভয়ে আতংকিত হলেও মুখে কিছু বলছে না। তবে ভাব ভঙ্গিতে রয়েছে আতংকের ছাপ।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের বাকী আর মাত্র কয়েকটা দিন। নিজ নিজ প্রচারণা নিয়ে প্রার্থীদের যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। এদিকে, বিএনপি-জামায়াত ও সমমনাদের বর্জনের মুখে এই নির্বাচনে এবার আগে থেকেই আলোচনায় ‘আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ যুদ্ধ’ অর্থাৎ আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই।
আর নিজ দলের এসব স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে হেভিওয়েট প্রার্থীরাও। এমনকি ডজন খানেকেরও বেশী প্রতাবশালী মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রীরাও পড়েছেন ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে।

শুরুর দিন থেকেই ব্যাপক আলোচনা পিরোজপুর ১ আসন নিয়ে। এবারও এখানে নৌকার মাঝি হয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইন সম্পাদক-সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী অ্যাডভোকেট শ.ম রেজাউল করিম। সরকারের পরপর দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে এই আসনে নৌকার প্রার্থী হয়েও এবার তাকে পড়তে হচ্ছে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী নিজ দলেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী, পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও এই আসনেরই সাবেক এমপি এম এ আউয়াল। সেয়ানে সেয়ানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে কেউ কাউকে ছাড় দেবার পাত্র নন। এরমধ্যে ঘটেছে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনাও। প্রাণও গেছে একজনের। স্থানীয়রা বলছেন, ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এই দুই প্রার্থীর।

আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসাবে খ্যাত গোপালগঞ্জ-১ আসনেও নৌকার প্রার্থী পড়েছেন ব্যাপক চাপের মুখে। এআসনে নৌকার প্রার্থী ৫ বারের এমপি ও সাবেক মন্ত্রী কর্ণেল ফারুক খানের কপালেও যেন চিন্তার ভাজ এনেছে তার নিজ দলেরই স্বতন্ত্র প্রার্থী মুকসুদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কাবির মিয়া। এই নির্বাচনে নৌকা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করছেন ভোটাররা।

বেলাব-মনোহরদী নিয়ে নরসিংদী-৪। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। তার প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সাইফুল ইসলাম খান। মনোহরদী উপজেলা পরিষদের পাঁচবারের এই চেয়ারম্যান এতোমধ্যে ছেড়েছেন তার চেয়ারম্যানের পদও। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বড় একটা অংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথে থাকায় বেশ চাপের মুখে পড়েছেন এই আসনের নৌকার মাঝি শিল্প মন্ত্রী নুরুল মজদি হুমায়ুন। ইতোমধ্যে একটি প্রচারণা থেকে প্রকাশ্যে টাকা দেওয়ার একটি ভিডিও ভাইরালও হয়েছে এই মন্ত্রীর।

নতুন শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে এরই মধ্যে বেশ আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী ডা.দিপু মনি। চাঁদপুর-৩ আসন থেকে ৪র্থ বারের মতো নৌকার প্রার্থী কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ঈগল প্রতীক নিয়ে এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, চাদঁপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ড. সামছুল হক ভূঁইয়া।

দীপু মনির বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা, মেঘনা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় তাকে নিয়ে তৈরী হওয়া বিতর্কসহ নানাবিধ কারণে নৌকার পক্ষের প্রচারণায় দেখা যাচ্ছেনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ স্থানীয় নেতাদের। স্থানীয় বলছেন, আওয়ামী লীগের একটি অংশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগবিরোধী ভোটাররা ভোট দিলে পাল্টে যেতে পারে নির্বাচনী সমীকরণ।

হবিগঞ্জ-৪ আসনে নৌকার প্রার্থী বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলীর সঙ্গে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইয়েদুল হক ওরফে ব্যারিস্টার সুমন। সামাজিক বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে গত কয়েক বছরে ব্যারিস্টার সুমনের ব্যাপক পরিচিতি গড়ে উঠে। এলাকার তরুণরা তার পাশে। আর মাহবুব আলীর ভরসা চা বাগানের ভোট।

মন্ত্রীপরিষদের প্রবীণ সদস্য যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।গাজীপুর-১ আসনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কালিয়াকৈর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাসেল। জানাগেছে, রেজাউল করিমের সাথে রয়েছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু এবারও নৌকার প্রার্থী হয়েছেন নেত্রকোণা-২ আসন থেকে। তিনি নেত্রকোন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী ফুটবলার আরিফ খান জয়। আরিফ খান ও তার পরিবারের সদস্যরাও জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী হওয়ায়, ভোটের সমীকরণ নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত এই মন্ত্রী।

একই মন্ত্রনালয় অর্থাৎ সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এবারও প্রার্থী হয়েছেন আদিতমারী ও কালিগঞ্জ নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ আসনে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি সিরাজুল হক। জেলা আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ এমনকী মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের ছোট ভাই কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুজ্জামান আহমেদরও অবস্থান নৌকার বিরুদ্ধে। ফলে, সরকারের এই মন্ত্রীকেও এবার নিজ দলের স্বতন্ত্রপ্রার্থীর জন্যই পড়তে হচ্ছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে।

আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ঢাকা-১৯ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ডা.এনামুর রহমান। এই আসনে তার বিরুদ্ধেও রয়েছে নিজ দলেরই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. তৌহিদ জং ওরফে মুরাদ জং হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এছাড়াও স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ঘাম ঝড়িয়ে ছাড়ছেন নৌকার প্রার্থীর।
স্থানীয়রা বলছেন, স্বতন্ত্র অন্য প্রার্থীরাও আওয়ামীলীগেরই নেতা হওয়ায় এবার নির্বাচনে বেশ ধরাশায়ী অবস্থার মুখে এখানকার নৌকার প্রার্থী ও সরকারের এই মন্ত্রীর।

মেহেরপুর-১ আসনের বর্তমান এমপি ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী এখানকার সাবেক এমপি প্রফেসর আব্দুল মান্নানের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। দলীয় কমিটি গঠন,স্বজনপ্রীতি এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নসহ নানা অভিযোগে দলের একাংশের মনোনয়ন প্রত্যাশী ডজনখানেক নেতা জোটবদ্ধ হয়েছেন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন- ফরহাদ হোসেন বাদে যাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে তার পক্ষেই ভোট করবেন। ফরহাদ হোসেন আবারো নৌকা পেলে ওই অংশের নেতারা ঢাকঢোল পিটিয়ে নৌকার বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধের ঘোষণা দেন।

শরীয়তপুর-২ আসনে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমের প্রতিদ্বন্দ্বী দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খালেদ শওকত আলী। তিনি সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর ছেলে। এখানেও দুই পক্ষের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রচারণায় পিছিয়ে নেই কেউই।

রাজশাহী-৬ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন শক্তিশালী দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি রাহেনুল হক রায়হান। তিনি এই আসনেরই সাবেক দলীয় সংসদ সদস্য।

একইভাবে, নাটোর-৩ আসনের নৌকার প্রার্থী আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছে দু্ইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক, গাজীপুর-২ আসনের প্রার্থী যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা কাজী আলিম উদ্দিন ও যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম।

নওগাঁ-১ আসনে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন নিয়ামতপুরের আওয়ামী লীগ নেতা ও পাঁচবারের ইউপি চেয়ারম্যান খালেকুজ্জামান। জামালপুর ২ আসনে নৌকার প্রার্থী ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খানের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা জিয়াউল হক।স্থানীয়রা বলছেন, সুষ্ঠ ভোট হলে এসব আসনে সরকারের হেভিওয়েট মন্ত্রীরা তাদের নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছেই হতে পারেন ধরাশায়ী।

 

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button