রাজনীতি

গোল্ড হুন্ডিতে টাল মাফিয়ারা-

 

এস রহমান : আন্ডারওয়ার্ল্ডে গোল্ড হুন্ডির নিয়ন্ত্রণ নিতেই ‘নাই’ করে দেয়া হয়েছে এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারকে। এক সময় আনার নিজেও ছিলেন চরম মাফিয়া। বহু মামলা ছিল তার নামে। এমপি হয়ে গেলেও মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণ তিনি ছাড়েননি। এরই জের ধরে ৫কোটি টাকায় ভাড়াটে খুনী দিয়ে এমপি আনারকে হত্যা করে প্রতিপক্ষ মাফিয়ারা।

এমপি আনার খুনে প্রধান সন্দেহভাজন আখতারুজ্জামান ওরফে শাহিনকে চিহ্নিত করেছে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি।ঢাকা ঝিনাইদহ কোর্টচাঁদপুর হুন্ডি ও গোল্ড স্মাগলিং সিন্ডিকেট এই খুনের মদদদাতা বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। গোয়েন্দারা ইতিমধ্যে এই মাফিয়া হুন্ডি সিন্ডিকেট কে চিহ্নিত করে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে।

গোয়েন্দা অনুসন্ধানে মিলেছে, স্বর্ণ চোরাচালানের আন্তর্দেশীয় চক্রের দ্বন্দ্বের জেরে পরিকল্পিতভাবে আনোয়ারুলকে ভারতে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মো. আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহিন নামের এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কলকাতার নিউ টাউনে যে ফ্ল্যাটে সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, সেটি এই আক্তারুজ্জামানের ভাড়া করা। তিনি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. সহিদুজ্জামানের ছোট ভাই।

কলকাতার পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিউ টাউনের ওই ফ্ল্যাট (ট্রিপলেক্স) নাজিয়া বানু নামের এক নারীর কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিলেন মো. আক্তারুজ্জামান। নাজিয়ার স্বামী সন্দ্বীপ রায় ওই ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিক। তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আবগারি দপ্তরের কর্মকর্তা। গত ২৫ এপ্রিল ফ্ল্যাট ভাড়ার চুক্তিপত্র সইয়ের পর ৩০ এপ্রিল আক্তারুজ্জামানকে ফ্ল্যাটটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ তথ্য নাজিয়া কলকাতার নিউ টাউন থানা পুলিশকে দিয়েছে।

আক্তারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ খুঁজছে। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি গত সোমবার ঢাকা থেকে একটি ফ্লাইটে দিল্লি হয়ে কাঠমান্ডু চলে গেছেন।
এ ঘটনার তদন্তে নেমে বাংলাদেশ ও কলকাতার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন তথ্য পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে দুই দেশের তদন্তকারীদের মধ্যে তথ্য বিনিময় হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ইতিমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে; যাঁরা ঘটনার পর ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলেন। ঢাকায় ডিবির সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার তিনজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করছেন যে তাঁরা সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমকে হত্যায় সরাসরি জড়িত।

এ ছাড়া আনোয়ারুল ভারতে গিয়ে যে বন্ধুর বাসায় উঠেছিলেন, সেই গোপাল বিশ্বাসও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে জানা গেছে। আবার, সংসদ সদস্য আনোয়ারুলের বিরুদ্ধেও চোরাচালানসহ অন্তত ২১টি মামলা ছিল। যদিও পরে সেসব মামলা থেকে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোল রেড নোটিশও জারি করেছিল। অবশ্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সেটা তুলে নেওয়া হয়।

পুলিশ জানতে পারে, আক্তারুজ্জামান ও আনোয়ারুল আজীম পুরানো বন্ধু। আক্তারুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। ঢাকায় গুলশানে আক্তারুজ্জামানের বাসা রয়েছে। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে তাঁর বাসা।হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কলকাতার ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার সময় আক্তারুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিলেন; যা ভাড়ার চুক্তিপত্রেও উল্লেখ আছে।

বুধবার সকালে কলকাতার উপকণ্ঠে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার মানব শ্রিংলা সাংবাদিকদের জানান, আনোয়ারুল আজিম শেষ যে ভাড়া গাড়িটি কলকাতায় ব্যবহার করেছিলেন, সেই ক্যাবটির চালক জেরার মুখে স্বীকার করেছে ওই যাত্রীকে খুন করে তার দেহ টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে লাশ কোথায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলেননি।

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি সূত্র দাবি করেছে, শাহিন কলকাতা থেকে দেশে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গেছেন। কলকাতার সিআইডি বলছে, এই প্রবাসি বেশির ভাগ সময় নিজ এলাকা, ঢাকা ও কলকাতায় বাসা ভাড়া করে থাকে। তার সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতা, ব্যবসায়ী,প্রশাসনের বড় কর্মকর্তাদের সখ্য রয়েছে।

কোটচাদপুর শহরে পুরানো খেয়াঘাট এলাকাতে শাহিনের একটি বাড়ি রয়েছে। তাদের গ্রামের বাড়ি উপজেলার এলাঙ্গী গ্রামে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের আইজি (সিআইডি) অখিলেশ চতুর্বেদী জানান, যেই ফ্ল্যাটটিতে সংসদ সদস্য এসে উঠেছিলেন সেটি সন্দীপ রায় নামে এক ব্যক্তির। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আবগারি দপ্তরে কাজ করেন। তিনি ভাড়া দিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (প্রবাসী বাংলাদেশি) বাসিন্দা আখতারুজ্জামান নামের এক ব্যক্তিকে।

এর আগে চিকিৎসার জন্য গত আট দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর কলকাতায় এমপি আনার খুন হন বলে বুধবার খবর আসে। তবে তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কি না তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে সন্দেহে একটি গাড়ি আটক করেছে কলকাতা নিউ টাউন পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button