ঢাকায় কোকেন মাফিয়া-১৩০ কোটি টাকার কোকেন জব্দ

১৩০ কোটি টাকা মূল্যের ৮.৬৬ কেজি কোকেনসহ আফ্রিকান নারী মাফিয়া ক্যারেন পেটুলা স্টাফেল যাত্রীকে আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দারা । মাদক চোরাচালানের কেন্দ্র গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের ঠিক মাঝখানে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে মাফিয়ারা।
শফিক রহমান : আন্তজার্তিক মাদক চোরাচালানের ঝুঁকি বাড়ছে বাংলাদেশে। ঢাকায় বার বার কোকেনের চালান ধরা পড়ছে। এবার উদ্ধার হয়েছে ১৩০ কোটি টাকা মূল্যের ৮.৬৬ কেজি কোকেন। চালানের সঙ্গে এবারও ধরা পড়েছে আফ্রিকান নারী মাফিয়া। শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা মূল্যের ৮.৬৬ কেজি কোকেনসহ এক আফ্রিকান নারী যাত্রীকে আটক করেছে তারা। মাদক চোরাচালানের কেন্দ্র গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের ঠিক মাঝখানে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে মাফিয়ারা। কোকোনের মত দামি মাদক মাদকের আসল গন্তব্য পশ্চিম ইউরোপ কিংবা উত্তর আমেরিকা হলেও বাংলাদেশে বার বার ঢুকে পড়ছে কোকোনের চালান।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি পূর্ব আফ্রিকার দেশ মালাউয়ির নারী নমথান্দাজো টাওয়েরা সোকোর কাছ থেকে জব্দ করা হয় আট কেজির বেশি কোকেন।ঢাকায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাতার এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজে করে ৮ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেন এনেছিলেন নমথান্দাজো টাওয়েরা সোকো (৩৫)। বিমানবন্দরে তাঁর গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় তাঁর লাগেজে তল্লাশি চালিয়ে ওই মাদক জব্দ করা হয়।
সোকো মালাউয়ির নাগরিক এবং সেখানের একটি হাসপাতালে সেবিকা হিসেবে চাকরি করতেন। তিনি বাংলাদেশি কারও কাছে ওই কোকেন পৌঁছে দিতে মালাউ থেকে এসেছিলেন তা জাননাতে পারেইন। কোকেন চোরাচালানে আন্তর্জাতিক চক্র বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে সোকোর মাধ্যমে এই চালান এনেছিলবাংলাদেশে হেরোইন সহ নানা ধরণের মাদক পাওয়া গেলেও কোকেনের চালান ইদানিং বাড়ছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এর আগে ২০১৩ সালে পাউডার কোকেনের বড় একটি চালান উদ্ধার করা হয়েছিল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার দিবাগত রাত আড়াইটায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানায়, দোহা থেকে কাতার এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে একজন যাত্রী মাদক চোরাচালান করতে পারেন—এমন একটি গোপন সংবাদ তাদের কাছে আসে। এই তথ্যের ভিত্তিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে আসা সংবাদের পর যুগ্ম পরিচালকের নির্দেশনায় এয়ারপোর্টে কাস্টমস গোয়েন্দাদের একটি দল সতর্ক অবস্থান নেয়।
সোমবার দিবাগত রাত ২:৩০ মিনিটে ফ্লাইটটি ৬ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজে যুক্ত হওয়ার পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তথ্য অনুযায়ী ৩০এ সিটের যাত্রী মিস. ক্যারেন পেটুলা স্টাফেলকে শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে, ওই যাত্রীকে ভিসা অন অ্যারাইভাল থেকে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করিয়ে তার লাগেজসহ গ্রিন চ্যানেলে আনা হয়। সেখানে স্ক্যানিং শেষে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তার মালামাল পরীক্ষা (ইনভেন্ট্রি) করা হয়।
এ সময় তার লাগেজের ভেতর থেকে প্লাস্টিকের তিনটি জার উদ্ধার করা হয়, যার ভেতরে ফয়েল পেপারে মোড়ানো ডিম্বাকৃতির ২২টি প্যাকেটে কোকেন পাওয়া যায়। এসময় যাত্রীর এয়ারওয়েজ মেনিফেস্ট, পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস এবং সংশ্লিষ্ট লাগেজ টোকেন মিলিয়ে দেখা হয়।বিমানবন্দরে থাকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ইউনিট প্রাথমিক পরীক্ষায় এগুলোকে কোকেন হিসেবে শনাক্ত করে। মালামাল পরীক্ষার সময় বিমানবন্দর থানার দুজন এএসআই এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
জব্দকৃত কোকেনের মোট ওজন ৮.৬৬ কেজি, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৩০ কোটি টাকা।ওই যাত্রীকে আটক করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে চোরাচালানের অভিযোগে ফৌজদারি ও কাস্টমস আইনে মামলা দায়েরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, তাদের তৎপরতার কারণে দেশে মাদকের এই বিশাল চালান প্রবেশ রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
এর আগে ২০১৫ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রামে ড্রাম ভর্তি ১৮৫ কেজি সূর্যমুখী তেলের ঘোষণা দিয়ে তরল আমদানি করা হয়; যেখানে প্রায় ৬০ কেজি কোকেন ছিল এক ড্রামে। তৎকালীন শুল্ক গোয়েন্দা দপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খান জানিয়েছিলেন, ওই তরল কোকেনের চালান বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্যে আনা হয়নি। ডিজি বলেছিলেন, কোকেনের চালানটি চট্টগ্রামে আসার পর ২৫ দিন সেটি বন্দরে পড়ে ছিল এবং যার নামে এসেছিল, তিনি এটি আমদানীর কথা অস্বীকার করেন। জানা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া থেকে আনা একটি কন্টেইনারে ১০৭টি ড্রামের মধ্যে একটি ড্রামে তরল অবস্থায় ওই কোকেন আনা হয়েছিল।শুল্ক বিভাগের গোয়েন্দাদের ধারনা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অন্য কোনো দেশে মাদক চোরাচালানের জন্যে বাংলাদেশকে মধ্যবর্তী রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দারা বলছেন, কোকেনের চালান আটকের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে খুব বেশী পণ্য আমদানী না হলেও এখন সূর্যমূখী তেলের চালানে কোকেন সনাক্ত হওয়ার পর আগামীতে ঐ মহাদেশ থেকে আমদানী করা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নজরদারী বাড়ানোর ফলে ধরা পড়ছে কোকেন চালান।