জুলাইযোদ্ধারা ধরিয়ে দিল লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ ব্যক্তিকে-‘মব সৃষ্টির’ ঘটনায় ডিআরইউর নিন্দা

আলোচনা সভায় প্রথমে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন)। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে জামায়াত-শিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরাচ্ছে।’শেখ হাফিজুর রহমানের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরই মিছিল নিয়ে একদল ব্যক্তি ডিআরইউ মিলনায়তনে ঢোকেন। এ সময় তাঁরা ‘জুলাইয়ের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’,
স্টাফ রিপোর্টার : সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জন অবরুদ্ধ করে রাখার পর ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ধারী একদল লোক বৃহস্পতিবার ২৮ আগস্ট তাদের পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছেন, আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন), সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলমসহ ১৬ জন। এদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আটকের ১১ ঘণ্টা পর পুলিশ দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিআরইউতে একটি গোলটেবিল আলোচনা চলাকালে একদল ব্যক্তি নিজেদের জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে তাঁদের ওপর চড়াও হন। এরপর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তাঁরা এই ১৬ জনকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। রাত ১১টার দিকে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মো. নাসিরুল ইমলাম দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, আটক ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া চলছে। তাঁরা সবাই এখন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হেফাজতে আছেন।
সকালে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, শেখ হাফিজুর রহমানসহ অন্যরা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিতে যান। ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজক ছিল ‘মঞ্চ ৭১’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেনের। তবে তিনি সেখানে ছিলেন না। সকাল ১০টায় গোলটেবিল আলোচনা শুরুর কথা থাকলেও বেলা ১১টায় আলোচনা সভাটি শুরু হয়।
আলোচনা সভায় প্রথমে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন)। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে জামায়াত-শিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরাচ্ছে।’
শেখ হাফিজুর রহমানের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরই মিছিল নিয়ে একদল ব্যক্তি ডিআরইউ মিলনায়তনে ঢোকেন। এ সময় তাঁরা ‘জুলাইয়ের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’, ‘জুলাইয়ের যোদ্ধারা, এক হও লড়াই করো’ প্রভৃতি স্লোগান দেন। একপর্যায়ে তাঁরা গোলটেবিল আলোচনার ব্যানার ছিঁড়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পুলিশের (ডিএমপি) একটি দল এলে তাঁরা পুলিশের কাছে লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলমসহ অন্তত ১৫ জনকে তুলে দেন।পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আসাদুজ্জামান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দুপুর সোয়া ১২টার পর কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে লতিফ সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজনকে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যান।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের অবরুদ্ধ করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে আল আমিন রাসেল নামের একজন বলেন, ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা। এখানে পতিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে ষড়যন্ত্র করছে। জুলাই যোদ্ধারা বেঁচে থাকতে এমন কিছু আমরা মেনে নেব না।’
‘মব সৃষ্টির’ ঘটনায় ডিআরইউর নিন্দা
রাতে ওই আলোচনা সভা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে প্রতিবাদলিপি দিয়েছে ঢাকার প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিআরইউ।
এতে বলা হয়েছে, “ডিআরইউ’র একটি গোলটেবিল বৈঠকে বৃহস্পতিবার কতিপয় বহিরাগতদের হামলাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একদল ব্যক্তি নিজেদের ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান (কার্জন), সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানসহ কয়েকজনকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
”এসময় তাদেরকে নিবৃত্ত করতে গেলে ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মান্নান মারুফ, সদস্য আসিফ শওকত কল্লোল, সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদসহ কয়েকজনকে নাজেহাল করা হয়।”
এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনের সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল ঘটনার বলেন, “ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সবার জন্য উন্মুক্ত। সবারই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। এখানে অনুষ্ঠান করার বিষয়ে কোনো বিধিনিষেধ নেই। এই অনুষ্ঠান ঘিরে কতিপয় লোক গতকালই (বুধবার) ফেইসবুকে হুমকি দিয়ে প্রচারণা চালায়। এর প্রেক্ষিতে শাহবাগ থানাকে অবহিত করার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ডিআরইউ প্রাঙ্গণে পুলিশ দায়িত্ব পালন করে।
”অনুষ্ঠানটি উন্মুক্ত হওয়ায় হঠাৎ করেই একদল লোক অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করে মব সৃষ্টির চেষ্টা করে। ডিআরইউ নেতারা এবং সদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর পুলিশকে অবহিত করার পর তারা এসে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীসহ কয়েকজনকে তাদের হেফাজতে নিয়ে যায়।”
ডিআরইউ নেতারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের সময়েও ডিআরইউতে সবার কথা বলার সুযোগ ছিল।
“গণ অভ্যুত্থান চলাকালে তৎকালীন সরকারের বাধার মুখেও আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া নাহিদ, সারজিস ও হাসনাতরা এখানে কথা বলেছেন।
”আগামী দিনে কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে ডিআরইউ তা প্রতিহত করবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”
লতিফ সিদ্দিকীর বাড়ির নিরাপত্তায় পুলিশ
এদিকে ডিআরইউ এর ঘটনার পর সাবেক মন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক লতিফ সিদ্দিকীর টাঙ্গাইলের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের একটি ভিডিও বিকালের পর থেকে ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
এদিন সন্ধ্যার পর থেকে ভিডিওটি ভাইরাল হলে দেশ জুড়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়। পুলিশ ও স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, আগুন দেওয়ার ঘটনাটি গুজব।
কালিহাতী থানা সংলগ্ন লতিফ সিদ্দিকীর গ্রামের বাড়ির নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করার তথ্য দিয়ে কালিহাতী থানার ওসি জাকির হোসেন বলেন, আগুনের ঘটনাটি গুজব।
৪০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ভবনের ভিডিও ছড়িয়ে তাতে লতিফ সিদ্দিকীর নাম দেওয়া হয়েছে। ভবনটিতে আগুন জ¦লছে। সেখানে জনতা ভিড় করছেন। কিন্তু ভিডিওটি সম্পূর্ণ মিথ্যাও গুজব।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর একান্ত সচিব ফরিদ আহমেদ বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এটি গুজব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লতিফ সিদ্দিকীর বাসায় নিরাপত্তা দিয়ে রেখেছেন।