সম্পাদকীয়

ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ দ্বন্দ্বের স্থায়ী অবসান হওয়া জরুরি

সামান্য ঘটনা নিয়ে রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থী এবং দোকান মালিক, কর্মচারী ও হকারদের মধ্যে ৩০ ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। ফাঁকা গুলি, টিয়ার গ্যাস শেল নিক্ষেপ করেও পুলিশ সংঘর্ষ থামাতে পারছিল না। জানা যায়, সোমবার মধ্যরাতে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং মঙ্গলবার পুরো দিন থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। এ সময় নাহিদ হাসান নামে কুরিয়ার সার্ভিসের এক কর্মীর মৃত্যু হয় এবং সংঘর্ষের দু’দিন বাদে বৃহস্পতিবার মোরসালিন নামে আহত এক দোকান কর্মচারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সংঘর্ষে আহত হন ১৪ সংবাদকর্মী, অর্ধশত শিক্ষার্থীসহ শতাধিক ব্যক্তি। আহতদের মধ্যে মোশারফ হোসেন নামে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি এখনো শঙ্কামুক্ত নন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। বুধবার সকাল থেকে নিউ মার্কেট এলাকায় যানবাহন চলাচল শুরু হলেও দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। এলাকায় তখনো চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সাদা পতাকা উড়িয়ে বৃহস্পতিবার থেকে দোকানপাট খোলা শুরু হয় এবং ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী, সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরাখবর থেকে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যায় ইফতার আয়োজন নিয়ে নিউ মার্কেটের ৪ নম্বর গেটের ভেতরে থাকা ‘ওয়েলকাম’ ও ‘ক্যাপিটাল’ নামের দুটি ফাস্ট ফুডের দোকানের কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে এক পক্ষের সমর্থনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ১০-১২ জন তরুণ ভেতরে প্রবেশ করেন। তখনই দুই পক্ষে ধাওয়াধাওয়ি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তরুণরা চলে যান। এরপর থেকে কিছু সময় পর পর হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তা গোটা এলাকার হাজার হাজার দোকান কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরদিন এই সংঘর্ষ আরো ব্যাপক হয় এবং পুলিশের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি শান্ত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষসহ শিক্ষকরা এবং দোকান মালিক সমিতির নেতারা প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন। জানা যায়, পরিস্থিতি আরো অশান্ত করার জন্য কিছুকিছু পক্ষ ইন্ধন দিয়েছে।
নিউ মার্কেটে যা ঘটেছে তা যেমন অনাকাক্সিক্ষত, তেমনি মর্মান্তিক। এক নিরীহ তরুণ, যিনি সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে সংসার চালাতেন, চিরতরে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। একজন দোকান কর্মচারী যার দু’টি ছোট ছোট সন্তান ও স্ত্রীকে রেখে চলে যেতে হলো। এক শিক্ষার্থীর অবস্থাও আশঙ্কাজনক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরো ২৯ শিক্ষার্থী। তাঁদের অনেককেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছেন অনেক সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ। কেন এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া? কেউ যদি অন্যায় করে থাকে আইনের মাধ্যমে তার প্রতিকার করতে হবে। নিজেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা চাই, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা হোক এবং বিচারের মুখোমুখি করা হোক। তবে একটি গুরুত্বপূণ কাজ বাকি রয়ে গেছে, তা হলোÑ প্রায় সময়ই নিউমার্কেটের দোকানদারদের সঙ্গে ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও ইডেন কলেজসহ তার আশেপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে দ্ব›েদ্ব সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীদের প্রতি অভিযোগÑ তারা পণ্যের দাম নিয়ে যথেচ্ছাচার ও পণ্য কিনতে ত্রেতাদের জিম্মি করেন, ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নারীদের যৌন হয়রানিও ঘটে অহরহই। এগুলো খুবই গুরুতর অভিযোগ এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া জরুরি। অন্যদিকে ছাত্রদেরও সহনশীল আচরণ করতে হবে। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজসহ আশেপাশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দ্ব›েদ্বর স্থায়ী অবসাট ঘটাতে হবে। এ বিষয়ে উভয় পক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধন করতে হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button