লিড নিউজ

পত্রিকায় কি লিখল না দেখে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করুন

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি : পত্রিকা পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকর্তাদের পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, পত্রিকায় কী লিখল, তাতে ঘাবড়ে না গিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করুন। মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের এ পরামর্শ দেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আমি সেইভাবেই চলি। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছি বলেই আজকে দেশটা এগিয়ে যাচ্ছে। আমি যদি ভয়ে ভয়ে থাকতাম- ও কি লিখল, ও কি বলল, ও কি করল, তাহলে কোনো কাজ করতে পারতাম না। নিজের বিশ্বাস হারাতাম।কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অনেক সময় পত্রিকা পড়ে আপনারা অনেকে ঘাবড়ান। এই পত্রিকা এই সমালোচনা করেছে…। বাংলাদেশের কিছু পত্রিকা আছে তারা সবকিছুতে একদিন ভালো লিখলে পরের সাত দিন লিখবে খারাপ। এটা তাদের চরিত্র। আমি চিনি সবাইকে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাই স্কুল থেকে তো রাজনীতি করি। সবাইকে আমার চেনাই আছে। সব পরিবারকেও চেনা আছে।এটা তাদের চরিত্র। কাজেই ওই পত্রিকা দেখে ঘাবড়ানোর কোন দরকার নেই। আর পত্রিকা পড়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার নেই।১৯৮১ সালের ১৭ মে জোরপূর্বক নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে আসার দিনটির কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে আমি দেশে ফিরেছিলাম ‘কারণ, এটা আমার বাবার (জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) স্বপ্ন ছিল।তিনি বলেন, যখন আমি বিমান বন্দরে অবতরণ করি, তখন আমি আমার নিকটাত্মীয়দের কাউকে পাইনি, কিন্তু লাখো মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। এটাই আমার একমাত্র শক্তি এবং আমি এই শক্তি নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি এ সময় মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণের এবং এ মুহূর্তে দেশের জন্য যেটা দরকার সেই প্রকল্প গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে টাকা খরচ ও সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান।করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতি এবং খাদ্য সংকটের প্রসঙ্গ টেনে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশবাসীকে মিতব্যয়ী হওয়ার ও পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।

করোনা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ সারা বিশ্বের উন্নত এবং অনুন্নত দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে এবং দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ইউরোপের অনেক দেশ আছে যেখানে ১৭ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। জার্মানির মতো জায়গায় ভোজ্য তেলের অভাব। একমাত্র অলিভ ওয়েল ছাড়া কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। ইংল্যান্ডের মতো জায়গায় তেল নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে, এক লিটারের বেশি কেউ নিতে পারবে না। আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতি ৮ ভাগের ওপরে উঠে গেছে, ১০ ভাগে উঠে যাবে। ১ ডলারের ডিজেল-পেট্রলের দাম ৪ ডলারে উঠে গেছে।

তিনি বলেন, অনেক জায়গায় এখন মানুষের একবেলা খেতেই কষ্ট হচ্ছে এবং সমগ্র বিশে^ই এই অবস্থা বিরাজমান। তারপরও তাঁর সরকার এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সক্ষম হলেও আমদানি নির্ভর এ সব পণ্যের প্রভাব তো অর্থনীতিতে পড়বেই। কারণ, উৎপাদন যেমন হ্রাস পেয়েছে তেমনি শিপমেন্ট ব্যয় বেড়ে গেছে। যে কারণে দেশের ভেতর একটু মূল্যস্ফীতি বা জিনিস পত্রের মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। শেখ হাসিনা এই প্রেক্ষাপটে দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানান, সবাইকে আমি এটুকু অনুরোধ করব সবাই যদি একটু সাশ্রয়ী হন, মিতব্যয়ী হন বা সব ব্যবহারে সকলেই যদি একটু সতর্ক হন তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্রব্যমূল্য যে বেড়েছে এবং সেটা যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সেটা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। যদিও সমালোচকেরা সমালোচনা করবেই।আওয়ামী লীগ সরকারে আছে বলেই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ হয়েছে, না হলে দেশের মধ্যে অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।এ সময় তিনি জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই দেশের উৎপাদন বাড়ানোর এবং এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি না রাখার তাঁর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রী আসন্ন বাজেট ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমরা এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বাজেট দিতে যাচ্ছি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আজকে অনুমোদন দেব। সেখানেও আমি মনে করি প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সচিবরা এখানে রয়েছেন, পরিকল্পনা কমিশনের যারা রয়েছেন তাদেরকে অনুরোধ করব আমরা আপনাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্প অনুমোদন করে দেব বা প্রকল্প নেব এটা ঠিক। কিন্তু এ গুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আপনাদের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। যেটা দেশের জন্য একান্তভাবে প্রয়োজন এই মুহূর্তে আমরা শুধু সেগুলোই বাস্তবায়ন করব।

তিনি বলেন, কোনটা আমাদের এখনই প্রয়োজন সেগুলোই আমরা করব। আর যে গুলোর এখনই প্রয়োজন নাই সেগুলো একটু ধীর গতিতে করব, যেন আমাদের অর্থনীতির ওপর চাপ না পড়ে। কারণ, যেখানে বিশ^ব্যপী একটা মন্দা এবং পরিস্থিতি একটা দুর্ভিক্ষ অবস্থার দিকে যাচ্ছে সেখানে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, টাকা খরচের ক্ষেত্রে এবং সব ক্ষেত্রেই আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। অহেতুক আমাদের সম্পদ যেন আমরা নষ্ট না করি। সে গুলো আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে। আমরা যদি খুব ভালোভাবে হিসেব করে চলতে পারি তাহলে আমাদের দেশের কোন সমস্যা হবে না-এটা আমি বিশ্বাস করি।

সরকার পরিচালনায় এসে তিনি সকলকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার চেষ্টা করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গদিতে বসে কেবল হুকুম জারি নয়, সকলের সঙ্গে মিলে মিশেই কাজ করতে চেয়েছি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা তাঁর সঙ্গে কাজ করতে এসেছেন তাদেরকে তিনি এই অনুভূতি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, তিনি তাদেরই একজন এবং সকলের জন্য কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করাই তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি এ ক্ষেত্রে কোন প্রোটোকলের বেড়াজালে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে তাঁর দ্বার সকলের জন্য অবারিত রেখেছেন এবং যার যখন প্রয়োজন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ রেখেই কাজ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বিশেষ করে ‘রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প’ অহেতুক অধিক অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে ডিজিটাল বাংলাদেশের প্ল্যাটফর্মে অবাধ তথ্য প্রবাহের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন টক শো’তে সরকার বিরোধীদের ঢালাও সমালোচনার উত্তর দেন তিনি।তিনি বলেন, পিপিপি’র ভিত্তিতে পরিবেশ বান্ধবভাবে তৈরি এই অত্যাধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ আমাদের অর্থনীতির ভিত যে কতটা মজবুত করবে তা তারা চিন্তা করেন না।

আমরা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়াতে তারা তো এখন বিদ্যুৎ পেয়ে গেছেন। যখন ১০ ঘণ্টা ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেতেন না তখন এর চাহিদাটা বুঝতেন। আর কিছু লোকই থাকে যারা সব সময় সমালোচনা করতে পছন্দ করে, নিজেদেরটা তারা দেখে না, জনগণের ভালোমন্দ বোঝে না।এ সময় পদ্মা সেতুতে রেল লাইন রাখা এবং অর্থ ব্যয় নিয়ে সমালোচনার উত্তরে নানা পরিসংখ্যান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।তিনি বলেন, পদ্মাসেতুর একটি টাকাও আমরা কারও কাছ থেকে ধার করিনি বা ঋণ নিইনি। এটি বাংলাদেশের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে।

তিনি মানুষকে বিভ্রান্ত করার মতো তথ্য প্রদানকারী সমালোচকদের সংযত হয়ে কথা বলারও পরামর্শ দেন।শেখ হাসিনা বলেন, পত্রিকা পড়ে নয়, বরং দেশের মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুভব করে দেশের উন্নয়নে নানামুখী সিদ্ধান্ত নিয়ে এত দিন দেশ পরিচালনা করেছেন এবং সেটাই অব্যাহত রাখতে চান।প্রধানমন্ত্রী এ সময় বৈঠকে উপস্থিত সকলকে কোথায় কী লেখা হলো না হলো তা নিয়ে চিন্তা না করে নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলার আহ্বান জানান।

করোনাভাইরাস, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং সর্বোপরি বিশ্বব্যাপী চলমান অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে পারায় তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এবং কেউ আর বাংলাদেশকে পেছনে ফেরাতে পারবে না বলেও তাঁর দৃঢ় আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।এনইসির সভায় ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা করপোরেশনের প্রায় ৯ হাজার ১৩০ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদিত হয়েছে।

 

 

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button